Breaking News

কুড়িগ্রামের রাজারহাটের ভিডব্লিউবি'র তালিকায় সচ্ছল পরিবারের নারীদের নাম


কুড়িগ্রামের রাজারহাটের ভিডব্লিউবি'র তালিকায় সচ্ছল পরিবারের নারীদের নাম


কুড়িগ্রাম জেলার রাজারহাট উপজেলায় প্রভাবশালী ও সচ্ছল পরিবারের নারীদের নাম ভিডব্লিউবির (ভালনারেবল উইমেন বেনিফিট) কার্ডের তালিকায় অন্তর্ভুক্তির অভিযোগ উঠেছে। এতে প্রকৃত দুস্থ ও অসহায়রা সরকারি সুবিধা পাওয়া থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। 


২০২৫-২৬ অর্থবছরে রাজারহাট উপজেলার ৭টি ইউনিয়নে প্রায় তিন হাজার ২০০ অসহায়-দুস্থ ও প্রান্তিক নারীকে ভিডব্লিউবির তালিকায় অন্তর্ভুক্তকরণের কাজ শুরু হয়। সমাজের পিছিয়ে পড়া, দরিদ্র এবং প্রান্তিক নারীদের সহায়তার লক্ষ্যে সরকার এই প্রকল্প চালু করে। তালিকাভুক্তরা দুই বছর ৬ মাসব্যাপী প্রতি মাসে বিনামূল্যে ৩০ কেজি চাল পাবেন। এ ছাড়া মেয়াদান্তে তাদের সঞ্চয়ের অর্থ দেওয়া হবে। উপজেলা মহিলাবিষয়ক কর্মকর্তার কার্যালয় ও স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের সমন্বয়ে এই তালিকা করা হয়েছে। সপ্তাহখানেক আগে তালিকা তৈরির কাজ শেষ হয়। 


এরই মধ্যে রাজারহাট ইউনিয়নে তালিকাভুক্তিতে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। দুস্থ ও দরিদ্র নারীদের পাশাপাশি এতে প্রভাবশালী ও সচ্ছল পরিবারের নারীদের নামও অন্তর্ভুক্ত করার খবর পাওয়া যায়। 


রাজারহাট উপজেলা মহিলাবিষয়ক কর্মকর্তা জয়ন্তী রানীর সঙ্গে মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। দু’দিন অফিসে গিয়েও তাঁকে পাওয়া যায়নি।


রাজারহাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোঃ আল ইমরান বলেন, অভিযোগ পেলে তদন্ত করে সচ্ছল ও প্রভাবশালীদের নাম থাকলে তা বাতিল করা হবে।

অভিযোগের ভিত্তিতে রাজারহাট সদরের দেবিচরণ গ্রামে নুর আমিনের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, তাঁর বাড়িতে রয়েছে পাঁচ কক্ষের পাকা ভবন ও বাগান। রয়েছে চাষাবাদের জমি। তিনি সুপারি বেচাকেনার ব্যবসা করেন। অথচ তাঁর স্ত্রী লাজিনা বেগমের নাম ভিডব্লিউবিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। একই মৌজার সম্পদশালী তিন ভাই আল-আমিন, তারামিন ও নুর আমিনের স্ত্রীদের নামও তালিকাভুক্ত হয়েছে। স্থানীয় ইউপি সদস্য শহীদের নিকটাত্মীয় হওয়ায় তাদের স্ত্রীর নাম তালিকায় যুক্ত করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। ইউপি সদস্য শহীদের মেয়ে শিরিনা খাতুনের নাম রয়েছে তালিকায়। অথচ দুই বছর আগে রংপুরে বিয়ে হয়েছে তাঁর।


পার্শ্ববর্তী সুন্দরগ্রাম পুটিকাটা গ্রামের সেকেন্দার আলী সার ও কীটনাশকের ব্যবসা করেন। রয়েছে পাকা ভবন। নিজের জমিতে চাষাবাদও করছেন। তাঁর স্ত্রী মল্লিকা বেগমের নাম রয়েছে ভিডব্লিউবির তালিকায়। একই ইউনিয়নের ছাটমল্লিকবেগ গ্রামের গরুর খামারি ও স্থানীয় প্রভাবশালী আনিছুর রহমানের রয়েছে একাধিক আয়ের উৎস। তবু তাঁর স্ত্রী কোহিনুরের নাম অন্তর্ভুক্ত হয়েছে ওই তালিকায়। শুধু তাই নয়, তাঁর নিজের ভাই আশরাফ আলীর রয়েছে গরুর খামার, চাষাবাদের জমি ও অর্থ সম্পদ। অথচ তাঁর স্ত্রী জেসমিন বেগমের নামও দেওয়া হয়েছে ভিডব্লিউবিতে। 

দেবিচরণ গ্রামের ছোবহান আলীর মেয়ে সাজেদা আক্তারের রয়েছে পাকা ভবন, চাষাবাদের জমি। অথচ স্বামী পলাশের নাম গোপন করে বাবার পরিচয়ে তাঁর নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে ভিডব্লিউবিতে। অনেকে নিজের এবং পরিবারের অন্যদের নামে রেশন কার্ড, টিসিবি কার্ড, বয়স্কভাতার মতো একাধিক সরকারি সুবিধাভোগী রয়েছেন। 


নাফাডাঙ্গা গ্রামের সফিকুল ইসলামের স্ত্রী আমিনা বেগম, দেবিচরণ গ্রামের নজরুল ইসলামের স্ত্রী জবা পারভিন, ফজলু হকের স্ত্রী তছলিমা, সুন্দরগ্রাম পুটিকাটা গ্রামের মোক্তার আলীর স্ত্রী আয়েশা, সফিকুলের স্ত্রী তহমিনা খাতুন, ছাটমল্লিকবেগ গ্রামের জেভি বেগমসহ অধিকাংশ সচ্ছল পরিবারের নারী সদস্যদের নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। 


দেবীচরণ গ্রামের লাল মিয়ার স্ত্রী বেলী বেগম ও দুলালের স্ত্রী শাপলা বেগম বলেন, ‘হামার চাইতে গরিব এই গ্রামোত আর নাই। হামরায় আবেদন করি কার্ড পাই নাই। কার্ড হইছে বড় লোক নুর আমিন ও আলামিনের বউয়ের নামে।’ একই অভিযোগ ছাটমল্লিকবেগ গ্রামের আইয়ুবের স্ত্রী আফরোজার।


এ বিষয়ে অভিযুক্তদের মধ্যে তারামিন বলেন, ‘আমার ট্রলি আছে, তবে কাজ চলে না। বসি আছি এবং নিজের জমিজমা না থাকার কারণে বউয়ের নামে কার্ড করে নিয়েছি।’ একই গ্রামের জবা বেগমের স্বামী নজরুল ইসলাম বলেন, ‘আমি কেবল একটা হাফ বিল্ডিংয়ের কাজ শুরু করেছি। হাতে করি, পেটে খাই। মেম্বার শহীদ আমার মামাতো ভাই এবং মামাতো বওনাই (দুলাভাই) হয়। বিনা টাকায় করে দিয়েছেন, এজন্য করি নিয়েছি।’ ওই গ্রামের আরেক অভিযুক্ত তছলিমার স্বামী নিজের সচ্ছলতার কথা অস্বীকার করেন।


স্থানীয় ইউপি সদস্য শহীদ হোসেন বলেন, ‘আমি শুধু তারামিন ও নুর আমিনের স্ত্রীর নাম দুটি দিয়েছি। আমার মেয়ের নাম দিয়েছিলাম, পরে সেটা বাতিল হয়েছে। তবে অন্য নামগুলো কীভাবে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে, তা আমার জানা নেই।’

আনোয়ার সাঈদ তিতু, কুড়িগ্রাম জেলা প্রতিনিধি

No comments